সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০৫:২০ অপরাহ্ন

জাবির হলে মাদকের ভয়াবহতা কমছে না

স্টাফ রিপোটার:
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৯
  • ১৮

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) মাদকের ভয়াবহতা কমছে না। প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে পড়ছেন মাদকে। ছেলেদের পাশাপাশি আসক্ত হচ্ছেন মেয়েরাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট কিছু স্থান এবং আবাসিক হলের কিছু কক্ষকে মাদক সেবনের অলিখিত স্পট বানিয়ে ফেলেছেন তারা। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বহিরাগতরাও এসব স্থানে এসে মাদক সেবন করছে।

যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে, সকল প্রকার মাদকসেবন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর জাবির ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ছাদ থেকে প্রকাশ্যে মাদক সেবনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমবর্ষের এক শিক্ষার্থীসহ পাঁচ বহিরাগতকে আটক করেন প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা।

এ আগে গত ৩১ জুলাই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুইজারল্যান্ড নামক স্থান থেকে মাদক সেবনের প্রস্তুতির সময় ৫ তরুণীসহ ১০ বহিরাগতকে আটক করে জাবি প্রশাসন। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থীর সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা জানিয়েছেন।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে জাবি প্রক্টরিয়াল বডি ও নিরাপত্তা শাখার কাছে মাদক সেবনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বহিরাগতরা আটক হয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়েই ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। আর গণরুমে থাকা অবস্থায় সিনিয়রদের ডাকে ক্যাম্পাসে মহড়া হয়ে ওঠে প্রাত্যহিক বিকেলের রুটিন। এসব থেকেই শুরু হয় ধূমপান। এরপর ধীরে ধীরে গাঁজা, ফেনসিডিল ও মদ্যপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগরের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর নেশার হাতেখড়ি হয় এভাবেই। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে কখনো সিগারেটও ছুঁইনি। এখানে আসার পরে গণরুমে বন্ধুদের থেকে দেখে ধূমপান শুরু করি। পরে বড় ভাইদের কথামতো ক্যাম্পাসে মহড়া দেয়ার নামে গাঁজা, ফেনসিডিল ও মদ্যপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। সেই যে শুরু, এখন আর ছাড়তে পারি না।’ এভাবেই নিজের অভিমত প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের এক মেধাবী ছাত্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ে নেশাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে বন্ধু সার্কেল। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নতুনদের নিজের আয়ত্তে রাখার কৌশল হিসেবে অনেক সিনিয়রই তাদের মাদক সরবরাহ করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু জায়গা সন্ধ্যার পর মাদকদ্রব্য সেবনের আখড়ায় পরিণত হয়। এসব স্থানে নিয়মিত গাঁজা সেবনের আসর বসে। এছাড়া আবাসিক হলগুলোর ছাঁদ ও নির্দিষ্ট কিছু কক্ষেও রাতে গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিলের আসর বসে। আর বিভিন্ন উৎসবে ছাত্র হলগুলোতে মদ্যপান যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জানা গেছে, ক্যাম্পাসের অন্তত ২০-২৫ জায়গায় নিয়মিত মাদক সেবনের আসর বসে। সন্ধ্যার পর এসব স্থান দিয়ে গেলে হঠাৎ করেই নাকে পৌঁছায় মাদকের বিশেষ গন্ধ। শুধু সন্ধ্যা বা রাত নয়, দিনের বেলায়ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই ঘটছে মাদক সেবন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের মাদক সেবনের আলাদা আলাদা গ্রুপ আছে। এজন্য স্থানও নির্ধারণ করা থাকে। সন্ধ্যা বা রাতে মাদক সেবনের জন্য সবাই নির্দিষ্ট স্থানে হাজির হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, উঁচু বটতলার দোকানগুলোর পেছনে, মওলানা ভাসানী হল ও রফিক জব্বার হলের মধ্যকার জায়গা, জাবি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠ, সুইজারল্যান্ড, সুইমিংপুল, পরিবহন চত্বর, চিকিৎসাকেন্দ্র সংলগ্ন স্থান, টারজান পয়েন্ট, টিএসসি, ব্যাংকের পাশে, বিশমাইলের কর্মচারী ক্লাব সংলগ্ন স্থান, রাঙামাটি, বিভিন্ন যাত্রী ছাউনি, মুক্তমঞ্চসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত গাঁজাসহ নানা ধরনের মাদক সেবনের আসর বসে।

এছাড়া ছেলেদের আবাসিক হলগুলোর কিছু নির্দিষ্ট কক্ষেও প্রতিদিন নেশার আসর বসে। বিভিন্ন হলের এমন প্রায় অর্ধশত কক্ষের তথ্য পেয়েছেন এ প্রতিবেদক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশপাশি ও বহিরাগতরাও এসব স্থানে নিয়মিত মাদক সেবন করছেন। তারা শুধু মাদক সেবনের জন্যই ক্যাম্পাসে আসেন। সেবন শেষে আবার নির্বিঘ্নে চলে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যোগসাজশেই তারা এসব করছে। অনেক সময় বহিরাগতরাই ক্যাম্পাসে মাদক সরবরাহ করছে।

শুধু ছাত্ররা নয়, অনেক ছাত্রীও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন বলে জানা গেছে। জাবির ভেতরে ও বাহিরে একাধিক স্থানে বিক্রি করা হয় বিভিন্ন ধরনের মাদক। ক্যাম্পাসের বটতলার খাবারের দোকানের কর্মচারী ও নিরাপত্তা শাখার কিছু সদস্য এসব সরবরাহ করেন। এছাড়া পার্শ্ববর্তী এলাকার অনেকেই ক্যাম্পাসে মাদক সরবরাহ করছেন। আর এতে কিছু ছাত্রনেতার যোগসাজশ রয়েছে।

আবাসিক হলে মাদক সেবনের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক বশির আহমেদ বলেন, ‘আমরা হলে মাদক নির্মূলে চেষ্টা করছি। এ সম্পর্কে হলেগুলোর প্রভোস্টদের জানানো হবে। আর এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘মাদক ও সব ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে আমরা সোচ্চার। ক্যাম্পাসে মাদক সেবনের কোনো খবর পেলেই সেখানে গিয়ে খোঁজ নেয়া হয়। আর মাদক সেবনে কাউকে পেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..