রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:৫৩ অপরাহ্ন
সংখ্য অভিযোগ থাকলেও বহাল তবিয়তে চলছে!

ক্ষমতার দাপটে ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতাল

স্টাফ রিপোটার:
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
  • ২৫
এই হাসপাতালের লোকজন ডাকাত, এইটা হইলো গলাকাটা হাসপাতাল। গরীব রোগীদের আটকাইয়া রাইখা টাকা নেয়, রোগীদের ঠিকমতো চিকিৎসাও দেয় না। দুই দিন পরপরই এইখানে গন্ডগোল হয়, বেশি বিল কইরা বইসা থাকে, না দিলেই গ্যাঞ্জাম, এসব দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হইয়া গেছি। এভাবেই পান্থপথের ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালের বিষয়ে মন্তব্য করছিলেন একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি।

স্থানীয়রা আরও জানান, হাসপাতাল যারা পরিচালনা করেন তারা খুব ক্ষমতাবান লোক। আর তাই হাসপাতালটির বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও বহাল তবিয়তে আছে সবকিছু। অভিযোগ রয়েছে, সঠিক চিকিৎসার অভাবে হাসপাতালটিতে প্রায়ই রোগী মারা যায়, গরীব মানুষদের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে বুঝিয়ে নিয়ে আসা হলেও তারা কোনও চিকিৎসা পান না। হন ডাকাতি শিকার।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সবকিছু ঠিক আছে, ডিজিহেলথ (স্বাস্থ্য অধিদফতর) আমাদের অনুমতি দিয়েছে। কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন।

গত ২১ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এক গুরুতর রোগীর অস্ত্রোপচারের নামে সাড়ে তিন লাখ টাকা নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেন, শরীরে কোনও অস্ত্রোপচার না করেই রোগীকে ফেলে রাখা হয়। রোগী মারা যাওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও বেশি টাকা দাবি করে, কিন্তু মৃতদেহ তারা ফেরত দিতে চাচ্ছিল না। পরে বিভিন্নজনের মধ্যস্থতায় কিছু টাকা দিয়ে মৃতদেহ নেওয়া হয়।

তারও আগে এক রোগীর রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে ভুল লিখে হাসপাতালের কর্মচারীরা পরে বিষয়টি রোগীর স্বজনরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা স্বজনদের আটকে রাখে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পান্থপথের সিগনালের একটু আগে হাতের বাম দিকে ঢুকে গেছে ছোট-চাপা এক গলি। গলির শেষ মাথায় হাতের ডানে প্লাস্টার উঠে যাওয়া, উপরের দিকে জানালা ভাঙা, শ্যাওলা পরা একটি ভবনে ইউনিহেলথ হাসপাতালের অবস্থান। হাসপাতালটির ঠিক উল্টোদিকেই এলাকার ময়লা ফেলার ভাগাড়।

হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করে নিচতলায় একটি ওষুধের দোকান, রিসিপশন আর অপেক্ষমান রোগীদের বসার স্থানে কয়েকজনকে বসে থাকতে দেখা গেছে। সামনের দিকে অক্সিজেন সিলিন্ডার। ভেতরের দিকে সরু করিডোর, অপারেশন থিয়েটারের সামনে জুতা রাখার সেলফ, পাশের আরেকটি কক্ষে স্তুপ করে রাখা কার্টন।

প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা হাসপাতালের ভেতরে অবস্থান করেও কোনও চিকিৎসক, নার্স বা চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট কোনও ব্যক্তি বা চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনও কার্যক্রম এ প্রতিবেদকের চোখে পরেনি। হাসপাতালের তিন তলায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, কিন্তু তার পাশেই ময়লাসহ বিন আর ঝাড়ু। পাশের কক্ষটি শ্যাওলা পরা, যেকোনও সময় পলেস্তরা খসে পড়বে বলে মনে হয়। আইসিইউর সামনের দেয়াল থেকে পলেস্তরা উঠে গেছে, পাশেই ময়লাযুক্ত বেসিন, বেসিনের ঠিক নিচেই ময়লা ফেলার প্লাস্টিকের ড্রাম।

হাসপাতালের নিচতলা থেকে উপরে উঠতে গেলে কথা হয়ে কয়েকজন স্বজনের সঙ্গে। ময়লার ছবি তুলতে গেলে তারা বলেন, এই অবস্থাই, ভেতরে নোংরা, প্রতিদিন পরিষ্কার করা হয় না। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে রাখে, কাউকে কিছু বলা যায় না, সবার ব্যবহার খারাপ।

স্থানীয়রা জানান, ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালটি আগে মোহনা ক্লিনিক নামে পরিচালিত হতো। কয়েকবছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সাংবাদিক ও কলামিস্ট জগলুল আহমেদ চৌধুরীকে সেখানে নেওয়া হয়েছিল। তবে চিকিৎসক না থাকায় তাকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। সেই ঘটনার পর থেকেই মোহনা ক্লিনিক বন্ধ ছিল, কয়েক বছর আগে কোনও ধরনের উন্নতি না করে নতুন নাম দিয়ে হাসপাতালটি চালু করা হয়। কিন্তু হাসপাতালের চরিত্র বদলায়নি, কেবল নামটাই বদলেছে।

হাসপাতালের সামনের একাধিক দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই হাসপাতালে এমন কোনও সপ্তাহ নেই যে, রোগীর স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতালের লোকদের গন্ডগোল হয় না। স্বজনদের টাকার জন্য আটকে রাখা ও স্থানীয়দের দেনদরবার দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত।

হাসপাতালের জেনারেল ম্যানেজার বিশ্বজিৎ বৈদ্য বলেন, ২০১৭ সাল থেকে এই হাসপাতাল চালু হয়, তার আগে এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে ছিল।

হাসপাতালের একাধিক অভিযোগ সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনি আইডি কার্ডসহ আসেন তারপর তথ্য দেব।’ এসময় তাকে আইডি কার্ড দেখানো হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে রেস্ট্রিকশন আছে। আমি কতটুকু দেব, আপনি কতটুকু নেবেন-সেটা দেখতে হবে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..